আওয়াজ তোলো; বাৎসরিক সংকলন

আমি গর্বিত আমার পরিচয়ে

প্রতিটি মূর্হূত নারীরা লিঙ্গ বৈষম্যে শিকার হচ্ছে। এখনো অনেক পরিবার ছেলে সন্তান হলে অনেক খুশি হয়। কিন্তু মেয়ে সন্তান জন্ম নিলে মনে মনে নারাজ। শুধু আমাদের অনেকের আচারণগত পরির্বতন হয়েছে, ঠিক যৌতুকের মত, বর পক্ষ যখন কিছু দাবী করে আমাদের সমাজ তাকে যৌতুক বলে কিন্তু বর পক্ষ যখন বলে খুশি হয়ে যা দেন তখন আমাদের সমাজ তাকে যৌতুক বলে না।

এখনো বেশির ভাগ পরিবার ছেলে সন্তানের ক্যারিয়ার নিয়ে যত না ভাবে মেয়ে সন্তানের ক্যারিয়ার নিয়ে ততো ভাবে না। বরং বেশি ভাবে তাদের বিয়ে নিয়ে। বেশিরভাগ পরিবার ছোট থেকে মেয়ে সন্তানকে তৈরী করে অন্যের ঘরে যাওয়ার জন্য। মাঝে মাঝে মনে হয় পরিবার হল মেয়ে সন্তানদের শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার পাঠশালা। পরিবার প্রতিটি মূর্হূত মেয়ে সন্তানকে বুঝিয়ে দেয় এটি তোমার বাড়ি নয় তোমার বাড়ি হবে তোমার শ্বশুরবাড়ি।

শ্বশরবাড়ি যাওয়ার পর নারীরা সন্তান লালন-পালনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। কিন্তু তার কোন মূল্যায়ন নেই। গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীদের আনুষ্ঠানিক কোন স্বীকৃতি নেই। তাইতো একজন নারীর র্স্পশকারী মেসেজ- কেউ একজন তাকে প্রশ্ন করলো আপনি কি একজন র্কমরত নারী, নাকি একজন গৃহিনী ??

তিনি উত্তর দিলেন জ্বি, আমি একজন ফুলটাইম র্কমরত গৃহিনী –
আমি দিনে ২৪ ঘন্টা কাজ করি
আমি একজন মা
আমি একজন স্ত্রী
আমি একজন শ্বাশুড়ি
আমি একটা এলার্ম ঘড়ি
আমি একজন কুক
আমি একজন আয়া
আমি একজন শিক্ষক
আমি একজন চাকরানী
আমি একজন র্নাস
আমি একজন টুকিটাকি নানান কাজের পটু ব্যাক্তি
আমি একজন নিরাপত্তা র্কমচারী
আমি একজন পরার্মশদাতা
আমি একজন সান্তনাদাতা
আমি কখনো ছুটির দিন পাই না
আমি কখনো অসুখ বিসুখ ত্যাগ করতে পারি না
আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করে যাই
কাজ শেষ করে দিন শেষে কাজের প্রাপ্যতা হিসেবে আমি শুনি
“সারা দিন কি কর তুমি”
আসুন ঘর থেকে নারী বৈষম্য দূর করি। নারী যেন শুধু অলংকারে পরিনত না হয়। নারী যেন তার প্রাপ্য কাজের স্বাকৃতি পায়। করুনার চোখে নয় নারীকে সম্মান করবো তার র্কম পরিচয়ে।

প্রতিবেদনকারী

প্রতিবাদ শুরু করুন, লুকানো বন্ধ করুন

বিশ্বজুড়ে নারীদের কর্মক্ষেত্রে হয়রানি অতি পুরণো এক সমস্যা। বাংলাদেশে নারীরা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে আসছে হয়রানির মাত্রাও সেভাবে বাড়ছে। ধর্ষণের মত ঘটনাও কখনো কখনো এদেশে অলক্ষ্যে থেকে যায়। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ অতিরঞ্জিত একটি বিষয়। কিন্তু তিনি কি ঠিক ! যদি এসব বিষয় দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায় তবে ঘটনার মাত্রা ও ব্যাপকতা আরো বিস্তৃত হবে। যৌন হয়রানির ঘটনা নিরোধে হাইকোর্ট ২০০৯ সালে একটি গাইডলাইন ইস্যু করে। কিন্তু সেটা কর্মক্ষেত্রে নারী নিগ্রহ বন্ধ করতে পারেনি। পোষাক কারখানা থেকে কর্পোরেট চাকুরি – সর্বত্র আমরা যৌন হয়রানির ঘটনা প্রত্যক্ষ করে থাকি। তবে বেশির ভাগই ক্ষেত্রেই কোন রিপোর্ট বা প্রতিবেদন হয় না। কিন্তু কেন ?  কারণ, আমরাই ! আমাদের স্বভাব ! এসব ঘটনায় আমরা নিলর্জ্জের মত আঙ্গুল তুলি ঘটনার শিকার নারীর চরিত্রের দিকে ! যখন আমরা যৌন হয়রানির  কোন ঘটনা শুনি তখনি আমরা জানতে চাই ঘটনার শিকার নারী কি ধরণের পোষাক পরিধান করেছিল। সে কি পরিশিলিত পোষাক পরিধান করেছিল? তার চরিত্র এবং ভাবভঙ্গী কি যথাযথ ছিল? সে কি শালীন ছিল। অতপরঃ আমরা ঘটনার শিকার নারীকে সার্টিফিকেট দিয়ে থাকি -“তার নৈতিক চরিত্রের ঘাটতি আছে।” আমরা ঘটনার শিকার নারীকে আঘাতে রক্তাক্ত করি এবং রায় দিয়ে বলি “সে নিজেই তো হয়রানির ব্যবস্থা করে রেখেছে।” সমস্ত দায়িত্ব হচ্ছে হয়রানির শিকার নারীর, আর কারো নয়। যদি লোভনীয় কোন খাবার আপনি ঢাকনা ছাড়া রেখে দেন তো মাছি তা’ খাবেই। এখানে মাছির কি কোন দোষ আছে ?  না ! লোভনীয় বস্তুকে আব্রুর ভেতর রাখা তার দায়িত্ব। এসব কারণে একজন নারী যখন যৌন হয়রানির শিকার হন তখনো তিনি কোন কথা বলতে চান না। সে নিজের হতাশা লুকানোর চেষ্টা করে। এসব কারণে সে বিষাদগ্রস্ত হয়, তার সৃষ্টিশীলতা হ্রাস পায় এবং কখনো কখনো সে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে।
প্রায় ১০০ বছর আগে বেগম রোকেয়া ডাক দিয়ে ছিলেন “জাগো গো ভগিণী !” কিন্তু হায় ! এখনো আমরা জেগে উঠিনি। উঠেছি কি ?
কিন্তু সময় বদলাবে। তখন থেকে কি আমরা (নারীরা) পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করে আছি ?  না ! সময়কেই আমাদের পরিবর্তন করা উচিত। যে কোন ধরনের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। এটার বিরুদ্ধে আমাদের কথা বলা উচিত। আজ একজন নারী যদি যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে সে আরো শতাধিক মানুষকে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রণোদিত করে। আমাদের প্রয়োজন দৃষ্টান্ত তৈরি করা। দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। আমাদের দরকার হবে সেসব মুখ বন্ধ করানো যারা ক্ষতিগ্রস্তকেই লজ্জিত ও অভিযুক্ত করতে উচ্চকিত। যখন, যেভাবে আমরা হয়রানির ঘটনা প্রত্যক্ষ করি না কেন সেটার বিরুদ্ধে আমাদের কন্ঠস্বরকে জোরালো করা আবশ্যক। এটা সমাজকে একটা বার্তা দেবে যে কারো সাথে যৌন হয়রানির ঘটনায় কোন নারী অলস বসে থাকবে না। এতে সমাজ এটা অনুধাবন করবে যে যৌন হয়রানির কোন ঘটনা অলক্ষ্যে এবং প্রতিবাদহীনভাবে মিইয়ে যাবেনা। আমাদের বোনদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। গোপন করা এবং লুকানো অপরাধকে আরো অনেক বেশি উসকে দেবে। একজন যৌন নিগ্রহকারী আরো একজনকে নিগ্রহ করার সাহস দেখাবে। এটা নিগ্রহকারী এবং সমাজ কারো কোন কল্যাণ করবে না।  জেরালো এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগই একটি নারী বান্ধব, সুস্থ এবং সৃজনশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে। অন্তর্ভুক্তি, আত্ম নিয়ন্ত্রণ আর সুসংহত থাকার চেষ্টা এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

পথ তৈরী করতে হয়, কথা বলতে হয়……

শব্দগুলি সুন্দর – আদর ! স্পর্শ ! কিন্তু মন্দ আদর? নোংরা স্পর্শ? বড় হওয়া বুঝে ওঠার আগেই যখন আদরের নামে  বালিকাবেলায় মনের গভীরে জখম হয় কেউ জানে না! শৈশব কৈশোরের এসব দাগ মনের ভেতর আলোড়ন তুলে কিন্তু  মায়ের কাছে বলবে ভেবে কি এক সংকোচে বলা হয় না মেয়েটির। বাসায় কেউ নেই, এ সময় দরজায়  বেল শুনে দৌড়ে যেয়ে পরিচিত আত্মীয়কে সাদরে বসতে দেয় বছর পনেরোর কিশোরীটি। মা তাকে শিখিয়েছেন অতিথির সাথে সুন্দর আচরণ করতে।  কিন্তু টিভি দেখতে পাশে বসে অতিথির নোংরা স্পর্শ ! কী আতংক ! কী বিচ্ছিরি সেই মুহূর্ত!

নিজেকে স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন ও ইচ্ছা প্রবল ছিল, সাথে ছিল মা- বাবা – পরিবার। ছোট মেয়ে হিসেবে সকল সময়ে স্নেহ – ভালোবাসায় সিক্ত ছিলাম। কি কারণে জানিনা ছেলে- মেয়ে বৈষম্য ব্যাপারটা মেনে নেয়া বা মানিয়ে নেয়ার কথাটা শুনলেই প্রবল ক্রোধ হতো। পড়াশুনার ক্ষেত্রে চিকিৎসক নিজের পছন্দে ,যেখানে বৈষম্য আসে না।  আসলে কি তাই?

অনেক সহপাঠীনিকে দেখেছি একই পেশার মানুষের সাথে ঘর বেঁধে সমস্ত কিছু ‘ছাড় ‘ দিতে হয়েছে স্বামীর পড়া এগিয়ে নিতে আর নিজে শুধু সংসার সামলাতে। আমরা বাহবা দেই অঞ্জলি , শচীন টেন্ডুলকারের স্ত্রী হিসেবে সংসার আগলে রেখেছেন বলে অথচ তিনি একজন ‘ গোল্ড মেডেলিস্ট ‘ শিশু চিকিৎসক ছিলেন। হ্যা এতেই সমাজ তালি দেয় , সাধুবাদ জানায়। জীবন নিজের , তাকে চালানোর পছন্দ নিজের হতে হবে ।  বৈবাহিক অবস্থা জীবনবৃত্তান্তে অতীব গুরুত্বপূর্ণ কোন হিসেবে ??? এটা কি রকমের দক্ষতা প্রমান করে? মধ্যবয়স অব্দি এ জায়গাতে ‘সিঙ্গেল /অবিবাহিত’ তে টিক চিহ্ন দিতে যেয়ে কতগুলি চোখ ও প্রশ্ন আমায় বিদ্ধ করে তার হিসেবে নেই. একজন পুরুষ ‘মিসটার ‘ লিখে দিব্যি চলতে পারেন আর আমরা মিস/মিসেস/মিজ লিখে পুরুষের সাথে সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ দেখাতে  হয়!

কতরকমের  ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনেছি গুনে দেখিনি , আক্রমণাত্মক কথা  শুনেছি। আমি সব সময় নিজেকে মানুষ ভেবে এগিয়েছি। আমার মতন করে জীবনের সংজ্ঞা নিয়ে তাকে দেখতে আমার ভাল লাগে। কিশোর থেকে বৃদ্ধ চোখের চাহনী ও কৌতূহল মাড়িয়ে এতটা পথ এসেছি।এক সহকর্মী আমায় বলেছিলেন , আপা! আপনার সবদিক ভালো শুধু ওই ফেমিনিস্ট ভাবটা ঠিক না। ” আমি হেসে উত্তর দিয়েছিলাম ,” আপনার ওই কনজারভেটিভ দিকটা ছাড়া অন্য দিকগুলি খারাপ না , কাজ করা চলে। ”

আমাদের নারীদের সকল অর্জনকে মেধার সাথে অনুপাত না করে বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাথে মিলায়  এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। যে সমাজে অশিক্ষা ও ধর্মান্ধতা প্রবল সেখানে একজন রিকশাচালক , বাসের হেলপার , কাপড় বিক্রেতা থেকে অফিসের বড়কর্তা বা নেতা সকলের কাছেই আমরা ‘মানুষ ” হিসেবে প্রাপ্য সম্মান পাই না : আমাদের সাজপোশাকে দিয়ে পুতুল বানিয়ে মনমত কথা বলাতে পারলে তবে ‘ ভাল মেয়ে /সংসারী  আর স্পষ্ট করে সরাসরি চোখ রেখে সত্যি কথা বললে উচ্চাভিলাষী / খারাপ। সমাজব্যবস্থা তার পীড়ন দিয়ে শৃঙ্খল দিয়ে নারীদের তার সুরে  নাচতে বলবে – একে কী সভ্য সমাজ বলা যায় ?সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে তাকালে বিবমিষা হয় – এখানে ‘নারী” হচ্ছে চিড়িয়া / জিনিস। ধর্মের নাম করে নারীকে নিয়ত অবমাননা করা,অর্জনগুলি কে ম্লান করে দেয়া হয় বাজে শব্দ ব্যবহার করে।  যত ‘হেলপ লাইন ‘ আসুক না কেন সবচেয়ে বড় কথা আমাদের নীরবতা ভাঙতে হবে। নারীর প্রতি এই সামাজিক চাপ, হয়রানি ও সহিংসতার প্রতিবাদ করতে হবে। আমাদের সকলের একেকটা গল্প আছে যা আমাদের পীড়া দিয়েছে, আঘাত দিয়েছে , ক্ষতিগ্রস্ত করেছে শারীরিক ও মানসিকভাবে তার বিরুদ্ধে হাতে হাত রেখে দাঁড়াতে হবে উচ্চস্বরে বলতে হবে – আমায় অপমান করার অধিকার কারো নেই তা তুমি যত বড় পদেই আসীন থাকো না কেন। প্রতিরোধ করলে প্রতিকার হবেই  .যৌন হয়রানি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে পরিবার – বন্ধুমহল- কর্মক্ষেত্রে রুখে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই।  যে যার অবস্থা থেকে রুখে দাঁড়াই – জয় হবে, হতেই হবে। কারণ –

শুরু করতে হবে নিজ ঘর থেকেই

শুরু করতে হবে নিজ ঘর থেকেই

যা কিছু মহান সৃষ্টি চির- কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর!

বহু যুগ আগে কবি লিখে গেছেন নারী পুরুষের সমতার কথা, সম অবদানের কথা , কিš‘ এই এক বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কি আমরা হলফ করে বলতে পারছি নারী পুরুষে সমতা এসেছে?

এই সমতার কাজ আমাদের শুরু করতে হবে ঘর থেকেই। এখনো বাবা মায়েরা ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মাঝে প্রভেদ করে থাকেন। এখনো অনেক পরিবারে নারী গর্ভবতী হলে তার শশুর শাশুরী, আত্মীয় স্বজন এমনকি তার স্বামীও আশা করে একটি পুত্র সন্তান হবে। এখনো একটি পুত্র সন্তানের আশায় একজন নারীকে একে একে ৬/৭ টি সন্তানের জন্ম দিতে হয়,এবং তারপরও যদি পুত্র সন্তান না হয় তার জন্যও নারীকেই দোষারোপ করা হয়। এখনো মনে করা হয় একটি ছেলে হলো বংশের প্রদীপ, একটি মেয়ে তা নয়।

ছেলে মেয়ের মাঝে প্রভেদ গড়ে দেয় পরিবার থেকে শুরু করে আমাদের সমাজ। একই পরিবারে একটি ছেলেকে যতটা স্বাধীনতা দেয়া হয়, একটি মেয়ের বেলায় তা নয়, আবার একজন মেয়েকে যতটা কৈফিয়ত দিতে হয়, একজন ছেলের বেলায় তা নয়। তাই পরিবারের ছেলে সন্তান টি খুব সহজেই বুঝে যায় তার স্বাধীনতা তার ক্ষমতা মেয়ে সন্তানটির চেয়ে অনেক বেশি। পক্ষান্তরে মেয়ে সন্তানটি নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে। আর এভাবেই সমাজে নারী পুরুষের রৈষম্য তৈরী হয়। আর বড় হয়ে ছেলেটি (যখন পুরুষ হয়) তার স্বাধীনতা উপভোগ করে, ক্ষমতা দেখায় দুর্বল নারীর প্রতি, (পুরুষের চোখে নারী দুর্বল)।

এখানে আমি আমার খুব কাছের একজন মানুষের কথা বলবো, তার পরিবারের কথা বলবো।
অরুনিমা (ছদ্মনাম) আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। ৮ম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে ওর সাথে আমার পরিচয়। অরুনিমা বেশ ভালো ছাত্রী ছিল, তার চেয়েও বেশি ভালো মানুষ ছিল। আমাদের স্কুলের পাশেই ছিল ওদের বাড়ি । ওরা ২ বোন ৩ ভাই, বাবা মা শিক্ষিত ছিল। আমি প্রায়ই ওদের বাড়িতে যেতাম, ্ওর বাবা পুরুষের কর্তৃত্ব নিয়ে ওর মাকে তুই সম্বোধন করতো অরুনিমা আমর সামনে লজ্জিত হতো।

আমরা দুজনেই বই পড়তে ভালেবাসতাম, স্কুলের পাশেই একটি পাবলিক লাইব্রেরী ছিল যেটি ছুটির দিনেও খোলা থাকতো। স্কুলে কখনো লম্বা ছুটি থাকলে আমি লাইব্রেরীতে বই পড়তে যেতাম এবং অরুনিমাকে সঙ্গে নেয়ার জন্য প্রথমে ওদের বাড়িতে যেতাম। ওর বাবা প্রায়ই ওকে যেতে দিত না, প্রশড়ব করতো আমরা কী বই পড়বো ইত্যাদি, আবার কখনো কখনো যেতে দিত তবে বলে দিত ঠিক এক ঘন্টা পর ফিরে যেতে হবে। অরুনিমার বাবা কখনো বাড়িতে না থাকলে তার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হতো, ছোট ভাইও বাবার মতোই সময় বলে দিত। ওর ছোট ভাইও বই পড়তো, তাকে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা লাইব্রেরীতে কাটাতে দেখেছি, তার বেলায় কোন বিধি নিষেধ ছিল না।

৯ম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময় থেকে অরুনিমার বাবা ওর বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজা শুরু করলো। তার যুক্তি ছিল মেয়েকে বেশি পড়ালেখা করিয়ে কোন লাভ নেই সে তার স্বল্প আয় তার ছেলেদের পিছনে খরচ করবে, তাদের ভালো জায়গায় পড়ালেখা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করবে।

উ”চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় ওর বাবা ওর চেয়ে ১০ বছরের বড় একজন ভালো পাত্র (বাবার চোখে ভালো পাত্র) খুঁজেও পেল এবং তার সাথে অরুনিমার বিয়ে দিয়ে দিল। একটি সমম্ভাবনার মৃত্যু হলো!
১ বছর পর অরুনিমা গর্ভবতী হলো এবং সন্তান প্রসব করতে গিয়ে তার জীবন প্রদীপ নিভে গেল।
সন্তানের মৃত্যুতে অরুনিমার বাবা নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছিল, তবে কিছুটা সুখও হয়তো সে পেয়েছিল কারণ অরুনিমার সন্তানটি ছিল, পুত্র সন্তান।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়, ১ বছর পর অরুনিমার চেয়ে ৫ বছরের ছোট বোনটির বিয়ে দেয়া হলো তারই বরের কাছে।

তাই বলছি শুরু করতে হবে নিজ ঘর থেকেই। নারীকে শুধু নারী নয়, মানুষ বলে মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে। সব পুরুষই কোন না কোন পরিবারেই জন্ম নেয়, বেড়ে উঠে, তাই ঘরের শিক্ষাটা হতে হবে

“বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ তুলুন,নারীকে সম্মান করুন”

বিদ্রহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই উক্তি দিয়ে শুরু করা যায়,“এই বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যানকর,অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর”। কিন্তু আজ এ কথাটি কে বিশ্বাস করে ? আর করলে ও নারীরা আজ সবদিক দিয়ে অবহেলিত । তারা আজ পারছে না সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে,পারছে না তাদের ন্যায্য অধিকার। এর জন্য দায়ী কারা আপনারা কি জানেন-? আমি মনে করি এর জন্য দায়ী তারা, যারা আজ ঘরথেকে শুরু করে মাঠ প্রর্যায়,অফিস-আদালত,বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান,রাস্তা-ঘাট, যানবাহন ইত্যাদি স্থানে নারীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে চালায় নির্মম অত্যাচার । ্পুরুষরা যদি আসলে মন থেকে এই বর্বরতা দুর করতে না পারে তাহলে এর সমাধান কোন দিন ও হবে না । বিশেষ করে পোশাক কারখানা , এন জি ও,কর্পোরেট অফিস ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান গুলোতে নারীরা বেশি পরিমানে যৌন হয়রানির শিকার হয়। এইসব প্রতিষ্ঠানে নারীদেরকে বিভিন্ন আঙ্গিকে ও কৌশলে যৌন হয়রানির শিকার করা হয়। নারীরা বুঝেও অসহায়, কিছু বলতে পারে না , ফলে তারা গোপনে নিজের জীবনকে করে তুলে বিপন্ন । অনেকে নারীদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন- মিষ্টি খোলামেলা পরিবেশে রাখলে মাছি যেমন লোভে পরে, নারীরাও তাই।
পুরুষের মানসিকতা পরিবর্তন আনতেই হবে তা না হলে আমাদের দেশে নারী সমাজে সমতার সাথে বেঁচে থাকার অসম্ভব হয়ে পরবে।পরিবারে কর্মজীবী নারীদের অবদান অস্বিকার করা যাবে না কিন্তু তার পরেও আমরা তাদেরকে মুল্যায়ন করি না । করবে কি করে সমাজ পুরুষ দ্বারা শাসিত । সভ্যতার এই যুগেও একজন নারী স্বাধীনভাবে রাস্তা – ঘাটে একা চলতে পারে না , কারন সব বয়সের পুরুষ কোন না কোন খারাপ মন্তব্য করে বসে । আমি এই মানসিকতার পরিবর্তনের কথা বলছি । আমরা সমতার কথা বলি ,দৃষ্টি ভঙ্গি পরিবর্তন করি না তা হলে কিভাবে সমতা আসবে ।
আসলে পুরুষরা নিজেদের বদলাতে না পারলে একটা সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরী হবে না।পুরুষদের প্রকৃত শিক্ষাটা আসে নারীদের কাছ থেকে ,তাই নারীকে অসম্মান করলে এ শিক্ষার মূল্য কোথায়-?পুরুষরা কোন না কোন পরিবারে জন্ম গ্রহন করে, তাদের জন্ম হয় নারীদেরেই গর্ভে । তাই মানষিকতা হতে হবে সুন্দর ও অমায়িক।

প্রতিবাদ শুরু করুন, লুকানো বন্ধ করুন

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে কর্মস্থলে নারীর উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়নের পাশাপাশি নারীরা যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনী নারীদের নির্যাতন ও যৌন হযরাণীর শিকার হওয়ার ঘটনাও ভয়াবহ আকারে বাড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা লজ্জা, চাকরি হারানোর ভয়, মান-সম্মান হারানোর ভয়ে এই বিষয়গুলো বার বার এড়িয়ে যান। হয়রাণী বা নির্যাতন সহ্যের সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত নারীরা সাধারণত বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেন না। আর এই হয়রানী মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হওয়ার পথে এক বিরাট বাধা। কিন্তু কেন? কারণ আমরাই! মেয়েরাই মেয়েদের আসল শত্রুু। কারণ এ দেশের সমাজ ব্যবস্থা ও অধিকাংশ মানুষের রক্ষণশীল মানসিকতা, যখন কোন নারী হয়রানীর শিকার হন তখন এই সমাজ ও আমরাই তার পোষাক-আষাক, চলাফেরা, চরিত্রের দিকে নির্লজ্জের মত বাজে ইঙ্গিত করি। যৌন হয়রানীর অভিযোগের প্রত্যুত্তরে উত্তেজক কাপড় পড়ার অভিযোগ তো মেয়েদের শুনতে হয় অহরহ। ঘটনার শিকার নারীকে নানানভাবে প্রশ্নতুলে ঠাট্টা করে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করি। আর এই সবকিছুর বদৌলতে পার পেয়ে যাচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তি। যাদের বেশির ভাগই ক্ষমতার জোরে তাদের নারী সহকর্মীর উপর নিয়মিতভাবে হয়রানী চালিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ নারী লোক লজ্জা বা আরও হয়রানীর ভয়ে এ নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাওয়া থেকে বিরত থাকে। তাই দাঁতে দাঁতে চেপে কাজ করে যায় বেশির ভাগ কর্মজীবী নারী। না পারলে চাকরি ছেড়ে দেয়। একশন এইডের ১টি হিসাব অনুযায়ী কেবল ঢাকা শহরেই ৭৮ ভাগ নারী যৌন হয়রানীর শিকার হয় যার মধ্যে কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, যানবাহন। আমাদের দেশের জিডিপি উন্নয়নে শতকরা ৩৪ ভাগ আসে কর্মজীবী নারীর অবদান থেকে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১৮.৪ মিলিয়ন নারী শ্রম-বাজারের সাথে যুক্ত। এই বিশাল সংখ্যক নারী তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ না। গার্মেন্টেসের কর্মজীবী নারীদের উপর জরিপ করে দেখা গেছে ২.২% মেয়ে যৌন হয়রানীর প্রতিবাদ করে। তাহলে কি বেড়েই চলবে কর্মজীবী নারীদের প্রতি এই হয়রানির মাত্রা? কোন কি সুরাহা নেই? ২০০৯ সালের ১৪ই মে মহামান্য হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরী করে। কিন্তু সেটা কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি বন্ধ করতে পারে নি। বাংলাদেশে নারী আন্দোলন রয়েছে বটে, কিন্তু নাগরীক চৈতন্যে তার কোন প্রভাব পড়েছে, সে কথার কোন প্রমান নেই। এত দিনে আরও একটা জিনিস স্পষ্ট হয়েছে। যৌন হয়রানি অথবা অন্য যে কোন প্রশ্নে নিজেদের অধিকার আদায় করার এই লড়াইটা নারীদের একাই লড়তে হবে। উদার আধুনিক পুরুষেরা কবে পুরোনো সংস্কার ঝেড়ে ফেলে নারীদের সঙ্গে হাত মেলাবেন, সেই পরিবর্তনের জন্য যদি অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে দিল্লি দুর হস্ত। ফলে লড়তে হবে নারীদের নিজেদের। নতুন যে লড়াইয়ে নারীরা নেমেছেন, তার লক্ষ্য একদিকে ব্যক্তিগত আত্মসম্মান উদ্ধার, অন্যদিকে সামাজিকভাবে নিজের জায়গা করে নেওয়া। নারীর যৌন হয়রানি ঠেকাতে হলে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সেটা ঘটবেনা যতক্ষণ না নারীরা নিজেরাই ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু সেই পরিবর্তন যত দিন না হচ্ছে, তত দিন নারীরা কি মুখ বুজে বসে থাকবেন? নারীবাদী লেখক সারাহ সেলজার জবাব দিয়েছেন, মোটেই না। নারীদের প্রতি তার পরামর্শ; চুপ করে থাকবেন না, প্রতিবাদ করুন। সব হয়রানির কথা একে অপরকে জানান। জোট বাঁধুন, সামাজিক তথ্য মাধ্যমে মত বিনিময়ে অংশ নিন। কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি নারীকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। যৌন নিপীড়নের ঘটনা কর্মক্ষেত্রে গোপন রেখে অপরাধীকে প্রশ্রয় না দিয়ে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব পরিহার, জোরালো ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ-ই পারে কর্মক্ষেত্রে নারী বান্ধব, সুস্থ এবং সৃজনশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে।

যৌন হয়রানী ও নিপিড়ন

যৌন হয়রানী ও নিপিড়ন যৌন হয়রানী ও নিপিড়ন যৌন সংক্রান্ত অবাঞ্জিত আবদারই যৌন হয়রানী বা নিপিড়ন। সেটি হতে পারে ছেলে মেয়েকে বা মেয়ে ছেলেকে। তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণত মেয়েরাই বেশি যৌন হয়রানী বা নিপিড়নের স্বীকার হয়ে থাকে। একটি মেয়ের অসম্মতির বিরুদ্ধে যৌন আবেদনই যৌন হয়রানী। যৌন হয়রানির শিকার হয়নি এরকম মেয়ের সংখ্যা পৃথিবীতে আছে কিনা আমার জানা নাই। কেউ প্রকাশ করে আবার কেউ করে না। আবার কেউ যৌন হয়রানী হচ্ছে সেটাই বুঝে না। কারন আমরা বাঙ্গালী সহজ-সরল। আর বাঙ্গালীর সংস্কৃতি অনুযায়ী বিয়ে, অনুষ্ঠানে বোন জামাই বা বেয়াই বা কাজিনরা একটু আজে বাজে কুটুক্তি করবে বা গায়ে হাত দিয়ে কথা বলবে এটা যেন স্বাভাবিক বিষয়। ঘর থেকেই আমাদের সতর্ক হতে হবে।

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন রিপোর্ট বলছে বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ। বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ নাকি জীবনের যে কোন সময় ধর্ষনের শিকার হয়েছেন। প্রতিনিয়তই যৌন নিপিড়নের ঘটনা ঘটছে। একের পর এক ধর্ষন, যৌন আক্রমন এবং নিপিড়নের ঘটনায় মানুষ আতঙ্কিত। নারীরা আজ সকল কাজে এগিয়ে আসতে চাচ্ছে কিন্তু কিছু পুরুষের লোলুপ্য দৃষ্টির কারনে নারীরা সেভাবে এগোতে পারছেনা। এইসব বিকৃতমনা পুরুষগুলো নারী দেহের বিভিন্ন গঠনের উপর সর্বদা দৃষ্টি রাখে এবং কখন তাকে নিজ আয়ত্বে আনতে পারবে সে চিন্তা করে। তারা এতটাই মানসিক বিকারগ্রস্ত যে, যার উপর দৃষ্টি দিচ্ছে তার বয়স কত সে শিশু না বৃদ্ধা না যুবতী কোনটাই চিন্তা করে না। এক জরিপে দেখা গেছে তিন থেকে ষাট বছরের নারীরা বেশি যৌন নিপিড়নের শিকার হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৮৪ ভাগ নারী প্রতিনিয়ত যৌন নিপিড়নের শিকার হচ্ছেন। পথে-ঘাটে, যানবাহনে, মার্কেটে এমন কি বাসা বাড়ীতেও বাদ যায় না।

আজকাল আমাদের মূল্যবোধের এতটাই অবক্ষয় হয়েছে যে, ২ বছরের একটি অবুঝ শিশুও এই নিপিড়নের হাত থেকে রেহাই পাননি। যৌন নিপিড়নের অজ¯্র উদাহরণ রয়েছে। অভিনেত্রী প্রিয়তি চার বছর বয়সেই নিজ বাড়িতে যৌন নিপিড়নের শিকার হয়েছেন, নায়িকা সোনম কাপুড় তের বছরে সিনেমা হলে নিপিড়িত হয়েছেন। কুমিল্লায় ধর্ষনে নির্যাতিত হয়ে মৃত্যু বরন করেছেন তনু। নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হন পাবলিক বাসে বা ভিড়ের মধ্যে। পাবলিক বাসে চড়ে ৪১ শতাংশ নারীই যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন। গত বছরে ২৫ আগষ্ট বাসে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে ধর্ষনের পর নির্মমভাবে খুন হন জাকিয়া সুলতানা রুপা নামের এক তরুনী, ঐ বছরের ১০ই ফেব্রæয়ারী ময়মনসিংহের ভালুকায় বাসে আটকে রেখে ১৩ বছরের কিশোরীকে ধর্ষনের কথা কারও অজানা নয়। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ বলেন দেশে ৪৮ শতাংশ নারী চালক ও ভাড়া আদায়কারীর কাছ থেকে অপমানজনক/যৌন বিষয়ক ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইহা ছাড়াও মোহাম্মদপুর প্রি প্যারটিরি স্কুল এবং কলেজের প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রী যৌন নিপিড়নের শিকার হন গত মে মাসে।

বাংলাদেশের মহিলা পরিষদ রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এ বছরের জানুয়ারী থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৭৩৭ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৫৩। অগ্রদিকে পরিসংখ্যান পুরোর সর্বশেষ জরিপে দেখা যায় দশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ মেয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে, বর্তমান সমগ্র বিশ্বে ৩৬% নারীরা শারীরিক বা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) সারা দেশ থেকে গড়ে প্রতিদিন চার-পাঁচজন নারী ধর্ষনের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে। প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই শতাধিক ধর্ষিতার চিকিৎসা দিতে হচ্ছে সেখানে। এছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫৫৪টি অভিযোগ রুজু হয়েছে।

আমাদের দেশের ১৮ ধারায় আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। কোন নারী বা পুরুষের অসম্মতিতে তার দৈহিক গঠন নিয়ে কুটুক্তি বা স্পর্শ করাই যে যৌন হয়রানীর মধ্যে পড়ে এ বিষয়টাই মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। এই নিপিড়ন আমাদের ঘর থেকেই শুরু হয়। যৌন নিপিড়ন সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ এবং এর আইন সম্পর্কে জানিনা বিধায় প্রতিনিয়ত আমরা নির্যাতিত হচ্ছি।

বিজ্ঞান একদিকে যেমন আশির্বাদ অন্যদিকে অভিশাপ। কেননা ইন্টারনেট আবিষ্কারের ফলে আমরা যেমন এর সুফল পাচ্ছি তেমনি এর কুফলও পাচ্ছি যেমন পোর্ন বা নীল ছবি দেখার কোন বয়স সীমা নেই, অবাধে এসব দেখে যাচ্ছে মানুষ। যার ফলশ্রæতিতে অনেকে নিজেকে সামলাতে না পেরে যখন যে অবস্থায়ই নারী দেহ দেখে হায়নার মত তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। হউক সে ২ বছরের শিশু বা ৬০ বছরের বৃদ্ধা।

আমাদের দেশে ‘যৌন হয়রানি ও নিপিড়ন” বিষয়ক যে আইন রয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে এবং এর প্রচার-প্রচারণ বৃদ্ধি করতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো “যৌন হয়রানি ও নিপিড়ন” বিষয়ক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। মিডিয়াগুলোতে এর প্রচার বাড়াতে হবে। বিভিন্ন পেশায় যৌন নির্যাতনের বা হয়রানির প্রতিবাদে ‘মিট’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে জনপ্রিয় ক্যাম্পেইন চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের সকলের উচিৎ এর প্রচারনা বাড়ানো। কারণ এর প্রচারনা বৃদ্ধি পেলে আমরা নারীরা কতভাবে যে যৌন হয়রানির শিকার হই তা সবাই জানতে পারবে এবং সচেতনা বৃদ্ধি পাবে।
”বন্ধ করি যৌন হয়রানি
নিপিড়ন- নির্যাতনে আওয়াজ তুলি
সত্য, সুন্দর, নিরাপদ সমাজ গড়ি”।

প্রজন্মান্তরের সংগ্রাম

যখন আমরা লিঙ্গ বা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার কথা বলি প্রথমেই আমাদের কি মনে আসে? সাধারনত, আমরা বলি এবং চিন্তা করি নারীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতা, হয়রানী এবং যৌনশোষণের জন্য পাচারের শিকার হওয়া। নিঃসন্দেহে এগুলো বড় বিষয় এবং কোনভাবেই ছুড়ে ফেলে দেয়া যাবে না; কিন্তু আরো নীরবভাবে নারীদের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকে আরেকটা সমস্যার ব্যাপারে কি বলা হবে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে? আমি নারীদের মধ্যে মানসিক সমস্যা যেমন বিষন্নতা, উদ্বেগ এবং অন্যান্য মানসিক অসুস্থতার কথা বলসি যেগুলো নারীরা নিজেদের মধ্যেই বন্ধ দরজার পেছনে লুকিয়ে রাখে।

আমি কি বুঝাতে চাচ্ছি তা আরো দৃষ্টিগোচর করতে আমার আশপাশ এবং পরিবার-পরিজনেরনমধ্য থেকেই দুটি ঘটনা উল্লেখ করছি। রেহানার জন্ম সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে। রেহানা তাঁর ৪ ভাই এবং ৫ বোনের মধ্যে সবার বড়। রেহানাকে শৈশব থেকেই তাঁর ছোট ভাইবোনদের একের পর এক দেখাশোনা করতে হত ফলে তাঁর নিজস্ব শৈশব বলে কিছুই ছিল না। পরিস্থিতিকে আরো খারাপ তুলতেই যেন প্রত্যেকবার খাওয়ার সময় রেহানা এবং তাঁর বোনদের ডিম বা মুরগীর নিম্নমানের টুকরা দেয়া হত এবং তাঁর ভাইসহ অন্যান্য পুরুষদের ভালো টুকরা দেয়া হত। এর জন্য মূলত দায়ী ছিল তখনকার নারীরদের সামাজিক অবস্থান এবং দূর্ভাগ্যবশত তাঁর নিজের মা ও এতে জড়িত ছিলেন। এর সাথে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ও তিনি পাশবিকতার শিকার হন। কালক্রমে রেহানা বড় হন, তাকে একজন ধনী ব্যক্তির সাথে বিয়ে দেয়া হয় এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম দেন। নিজে তাঁর মায়ের দ্বারা পক্ষপাতমূলক আচরনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও, রেহানা তাঁর মেয়েকেও সেই একইভাবে আচরন করেছেন;এমনকি অবচেতন মনেও। বর্তমানে তিনি সামাজিক ও আর্থিকভাবে উচ্চবিত্ত স্তরে থাকা সত্ত্বেও তাঁর ছেলেকে মেয়ের তুলনায় বাড়তি সুবিধা দিয়ে থাকেন। তাঁর ছেলেকে স্কুল থেকে আনা নেয়া করার জন্য যেখানে চালকসহ গাড়ী দেয়া হয় যেখানে তাঁর মেয়ে অনিন্দিতাকে স্কুল থেকে হেটে বাড়ি ফিরতে বলা হয়।

অনিন্দিতা বড় হয় এবং অনেক উচ্চবিত্ত একজনের সাথে বিয়ে হয়। তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি ঢাকার বিশিষ্ট মানুষদের তালিকায় অন্যতম এবং উদারমনা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। যাইহোক, একদিন অনিন্দিতা তার স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকা পরিবারসহ অনিন্দিতাদের খাবার টেবিলে দেখে হতবিহবল হয়ে পড়ে। এই ঘটনা তার তীব্র মনোবেদনার কারন হওয়া সত্ত্বেও অনিন্দিতাকে এই জটিল অনুভূতিকে সমাধান না করেই মেনে নিয়ে এগিয়ে চলতে হচ্ছে।

নারীদের প্রতিদিনই এমন অগনিত মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাই এই গল্প দুটির মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছি। এমন অগণিত রেহানা ও অনিন্দিতা আছে – যাদের গল্প ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাদের ব্যথা একই রকম – তারা চিৎকার করে বলতেও পারে না। এবং তাদের সহজেই প্রান্তীয় জনগোষ্ঠী বলে চালিয়ে দেয়া যায় না, কারণ এমনকি প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এমন দেখা যায় না। তাদের সমস্যাকে সমস্যা বলেই বিবেচনা করা হয় না কারন তারা সিমাজের উচ্চবিত্ত্ব অংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

এধরনের বিষয় মেনে নেয়া মাঝে মাঝে খুবই কষ্টকর, তবু আমাদের দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে নিতে মেনে নেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। শৈশব থেকে সামাজিকীকরনের জোরালো প্রভাবের কারনে আমাদের মারা-বোনেরা মানসিক রোলার কোস্টার যাত্রার শিকার হয় যা তাদের প্রথিবীকে উলটে দিতে পারে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, নারীরাই অন্য নারীদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে দিচ্ছে। আসুন আমরা সহানুভূতিশীল হই, ছেলের বউদেরও নিজের মেয়ের মত করে আচরন করি আর অতীতের ভুল আবারো না করি।

“ যাকেই তুমি দেখছো প্রত্যেকেই একটি যুদ্ধ লড়ছে যা সম্পর্কে তোমার কোনো ধারনা নেই। দয়ালু হও। সবসময়।”

leave a comment