যৌন হয়রানী ও নিপিড়ন

যৌন হয়রানী ও নিপিড়ন যৌন হয়রানী ও নিপিড়ন যৌন সংক্রান্ত অবাঞ্জিত আবদারই যৌন হয়রানী বা নিপিড়ন। সেটি হতে পারে ছেলে মেয়েকে বা মেয়ে ছেলেকে। তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণত মেয়েরাই বেশি যৌন হয়রানী বা নিপিড়নের স্বীকার হয়ে থাকে। একটি মেয়ের অসম্মতির বিরুদ্ধে যৌন আবেদনই যৌন হয়রানী। যৌন হয়রানির শিকার হয়নি এরকম মেয়ের সংখ্যা পৃথিবীতে আছে কিনা আমার জানা নাই। কেউ প্রকাশ করে আবার কেউ করে না। আবার কেউ যৌন হয়রানী হচ্ছে সেটাই বুঝে না। কারন আমরা বাঙ্গালী সহজ-সরল। আর বাঙ্গালীর সংস্কৃতি অনুযায়ী বিয়ে, অনুষ্ঠানে বোন জামাই বা বেয়াই বা কাজিনরা একটু আজে বাজে কুটুক্তি করবে বা গায়ে হাত দিয়ে কথা বলবে এটা যেন স্বাভাবিক বিষয়। ঘর থেকেই আমাদের সতর্ক হতে হবে।

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন রিপোর্ট বলছে বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ। বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ নাকি জীবনের যে কোন সময় ধর্ষনের শিকার হয়েছেন। প্রতিনিয়তই যৌন নিপিড়নের ঘটনা ঘটছে। একের পর এক ধর্ষন, যৌন আক্রমন এবং নিপিড়নের ঘটনায় মানুষ আতঙ্কিত। নারীরা আজ সকল কাজে এগিয়ে আসতে চাচ্ছে কিন্তু কিছু পুরুষের লোলুপ্য দৃষ্টির কারনে নারীরা সেভাবে এগোতে পারছেনা। এইসব বিকৃতমনা পুরুষগুলো নারী দেহের বিভিন্ন গঠনের উপর সর্বদা দৃষ্টি রাখে এবং কখন তাকে নিজ আয়ত্বে আনতে পারবে সে চিন্তা করে। তারা এতটাই মানসিক বিকারগ্রস্ত যে, যার উপর দৃষ্টি দিচ্ছে তার বয়স কত সে শিশু না বৃদ্ধা না যুবতী কোনটাই চিন্তা করে না। এক জরিপে দেখা গেছে তিন থেকে ষাট বছরের নারীরা বেশি যৌন নিপিড়নের শিকার হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৮৪ ভাগ নারী প্রতিনিয়ত যৌন নিপিড়নের শিকার হচ্ছেন। পথে-ঘাটে, যানবাহনে, মার্কেটে এমন কি বাসা বাড়ীতেও বাদ যায় না।

আজকাল আমাদের মূল্যবোধের এতটাই অবক্ষয় হয়েছে যে, ২ বছরের একটি অবুঝ শিশুও এই নিপিড়নের হাত থেকে রেহাই পাননি। যৌন নিপিড়নের অজ¯্র উদাহরণ রয়েছে। অভিনেত্রী প্রিয়তি চার বছর বয়সেই নিজ বাড়িতে যৌন নিপিড়নের শিকার হয়েছেন, নায়িকা সোনম কাপুড় তের বছরে সিনেমা হলে নিপিড়িত হয়েছেন। কুমিল্লায় ধর্ষনে নির্যাতিত হয়ে মৃত্যু বরন করেছেন তনু। নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হন পাবলিক বাসে বা ভিড়ের মধ্যে। পাবলিক বাসে চড়ে ৪১ শতাংশ নারীই যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন। গত বছরে ২৫ আগষ্ট বাসে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে ধর্ষনের পর নির্মমভাবে খুন হন জাকিয়া সুলতানা রুপা নামের এক তরুনী, ঐ বছরের ১০ই ফেব্রæয়ারী ময়মনসিংহের ভালুকায় বাসে আটকে রেখে ১৩ বছরের কিশোরীকে ধর্ষনের কথা কারও অজানা নয়। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ বলেন দেশে ৪৮ শতাংশ নারী চালক ও ভাড়া আদায়কারীর কাছ থেকে অপমানজনক/যৌন বিষয়ক ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইহা ছাড়াও মোহাম্মদপুর প্রি প্যারটিরি স্কুল এবং কলেজের প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রী যৌন নিপিড়নের শিকার হন গত মে মাসে।

বাংলাদেশের মহিলা পরিষদ রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এ বছরের জানুয়ারী থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৭৩৭ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৫৩। অগ্রদিকে পরিসংখ্যান পুরোর সর্বশেষ জরিপে দেখা যায় দশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ মেয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে, বর্তমান সমগ্র বিশ্বে ৩৬% নারীরা শারীরিক বা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) সারা দেশ থেকে গড়ে প্রতিদিন চার-পাঁচজন নারী ধর্ষনের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে। প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই শতাধিক ধর্ষিতার চিকিৎসা দিতে হচ্ছে সেখানে। এছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫৫৪টি অভিযোগ রুজু হয়েছে।

আমাদের দেশের ১৮ ধারায় আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। কোন নারী বা পুরুষের অসম্মতিতে তার দৈহিক গঠন নিয়ে কুটুক্তি বা স্পর্শ করাই যে যৌন হয়রানীর মধ্যে পড়ে এ বিষয়টাই মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। এই নিপিড়ন আমাদের ঘর থেকেই শুরু হয়। যৌন নিপিড়ন সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ এবং এর আইন সম্পর্কে জানিনা বিধায় প্রতিনিয়ত আমরা নির্যাতিত হচ্ছি।

বিজ্ঞান একদিকে যেমন আশির্বাদ অন্যদিকে অভিশাপ। কেননা ইন্টারনেট আবিষ্কারের ফলে আমরা যেমন এর সুফল পাচ্ছি তেমনি এর কুফলও পাচ্ছি যেমন পোর্ন বা নীল ছবি দেখার কোন বয়স সীমা নেই, অবাধে এসব দেখে যাচ্ছে মানুষ। যার ফলশ্রæতিতে অনেকে নিজেকে সামলাতে না পেরে যখন যে অবস্থায়ই নারী দেহ দেখে হায়নার মত তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। হউক সে ২ বছরের শিশু বা ৬০ বছরের বৃদ্ধা।

আমাদের দেশে ‘যৌন হয়রানি ও নিপিড়ন” বিষয়ক যে আইন রয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে এবং এর প্রচার-প্রচারণ বৃদ্ধি করতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো “যৌন হয়রানি ও নিপিড়ন” বিষয়ক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। মিডিয়াগুলোতে এর প্রচার বাড়াতে হবে। বিভিন্ন পেশায় যৌন নির্যাতনের বা হয়রানির প্রতিবাদে ‘মিট’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে জনপ্রিয় ক্যাম্পেইন চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের সকলের উচিৎ এর প্রচারনা বাড়ানো। কারণ এর প্রচারনা বৃদ্ধি পেলে আমরা নারীরা কতভাবে যে যৌন হয়রানির শিকার হই তা সবাই জানতে পারবে এবং সচেতনা বৃদ্ধি পাবে।

”বন্ধ করি যৌন হয়রানি
নিপিড়ন- নির্যাতনে আওয়াজ তুলি
সত্য, সুন্দর, নিরাপদ সমাজ গড়ি”।

 

জাহানারা
শাখা ব্যবস্থাপক
সাজেদা ফাউন্ডেশন
পাগলা ৯নং শাখা

leave a comment