সন্তান ধারণকারী ছুটি “কেবল নারীদের বিষয়” নয়

লিঙ্গের ভূমিকা নীতি চিরকাল ধরে নারীদের উপর সাংসারিক দায়িত্বের, বিশেষ করে সন্তান পালনের দায়িত্বের, বোঝা চাপিয়ে আসছে। তবে সময় এখন বদলে যাচ্ছে আর তার সাথে বদলাচ্ছে লিঙ্গ ভূমিকার প্রতি মানুষের চিন্তাভাবনা। প্রচুর নারী এখন ঘরের বাইরের পরিবেশের সাথে জড়িত হচ্ছে এবং একটি সফল চাকরিজীবনের স্বপ্ন দেখছে। তাদের সেই স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবেনা যদি তারা একাই সেই বছর পুরোনো পুরো পরিবারের দায়িত্বের বোঝা বহন করতে থাকে। এর ফলে পুরো পৃথিবী বঞ্চিত হবে সেইসব মহিয়সী নারীদের জ্ঞান ও প্রতিভার আলো থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সমাজে একটি নতুন আদর্শ স্থাপন করা কোনো সহজ বিষয় নয়। এই আদর্শকে কর্মে পরিবর্তন করতে সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। তার কারণ হলো, নারীদের পশ্চাৎ যাত্রার কারণ কেবল পারিবারিক দায়িত্বের বোঝা নয়, তাদের অধিকার গুলোকে গুরুত্ব না দেয়াও তাতে ভূমিকা রাখে।নিউএইজ ওপিনিয়ন নামক পত্রিকার একটি প্রবন্ধের মোতে গার্মেন্টস কর্মীদের দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করে ঘরে পরে থাকা কাজের স্তূপে ফায়ার যেতে হয়। তা তাদের উপর কেবল কষ্টই বাড়ায় না, তাদেরকে বাধাগ্রস্থ করে কোনো রকম ইউনিয়ন সংক্রান্ত বিষয় অংশগ্রহণ করা থেকে। প্রচুর নারী এর ফলে মাতৃত্ব গ্রহণের পর তাদের অগ্রযাত্রার পথ থেকে ঝরে পরে। কেননা পারিবারিক দায়িত্বের সাথে চাকরিজীবনের দায়িত্ব পালন বজায় রাখা তাদের কাছে অতিরিক্ত মনে হয়। “Time Use of Women and Men (unpaid care work)” নামক একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে যে জাতীয় হিসাবরক্ষণ পদ্ধতিতে অবৈতনিক কাজ যেমন সন্তান ও বৃদ্ধ সদস্যের যত্ন নেয়া ও অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্ব পালন করার খবর অচিহ্নিত রয়ে যায়, কেননা নারীদেরকে আমাদের সমাজে বেশ অসুবিধাজনক স্থানে দেখা হয়। পত্রটিতে আরো বলা আছে যে, নারীরা গড়ে ১ ঘন্টা বৈতনিক কাজ করে যেখানে পুরুষরা কাজ করে গড়ে ৫ ঘন্টার ও বেশি। সুতরাং, সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত পিতৃত্ব ছুটির প্রথা চালু করা এবং সন্তান প্রতিপালনের জন্য সকল সুবিধার আয়োজন করা যাতে করে নারীদেরকে তাদের সাফল্যের যাত্রায় বিরতি দিতে না হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের বাহিরে পিতৃত্বকালীন ছুটি বেশ জনপ্রিয়; এমনকি আমাদের পার্শবর্তী দেশগুলোতেও। যদিও ঐতিহ্যবাহিভাবে মায়েরাই সন্তানের লালনপালনের দায়িত্ব নিভিয়ে আসছেন, এই মতাদর্শের পরিবর্তন দরকার। তবে তার পূর্বে বাঙালিদের মন থেকে মতাদর্শের পরিবর্তনের প্রতি কুসংস্কার দূর করতে হবে। এই সমাজে কোনো রকম পরিবর্তন, বিশেষ করে লিঙ্গ ভূমিকা সম্পৃক্ত কোনো পরিবর্তন, সহজ দৃষ্টিতে গৃহীত হয়না। এর মূল কারণ হলো পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ যা পুরুষদের দায়ে বাহিরে কাজ করার স্বাধীনতা এবং নারীদের উপর চাপিয়ে দেয় সন্তান ও পরিবারের সকল দায়িত্বের বোঝা যা তাদের এগিয়ে যাওয়ার স্পৃহাকে গোড়াতেই নিঃস্ব করে দেয়। ২০১৪ সাল হতে বাংলাদেশ সরকার ১৫ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এই আইনের সাথে সম্মতির খেয়াল রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা গড়ে তুলতে হবে জাতীয় পাঠপুস্তক বোর্ডএর উচিত গার্হস্থ অর্থনীতি ও কৃষি বিদ্যার বই আলাদা করে না ছাপিয়ে বই দুটির জ্ঞান একই বইয়ে লিপিবদ্ধ করে সকল ছাত্রছাত্রীদের তা পাঠ করতে বাধ্য করা। নিয়োগকর্তা এবং বিখ্যাত বেক্তিদের উচিত এই বিষয়ে উদাহরণ স্থাপন করা এবং অন্যদের তা করতে উৎসাহিত করা। ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন এক স্বাভাবিক প্রথা হিসেবে গণ্য হবে এবং তা আমাদের দেশকে লিঙ্গ সমতা অর্জনে প্রথম স্থানটি ধরে রাখতেও সহায়তা করবে।

leave a comment